Saturday, January 18

অনলাইনে ভয়ানক ফাঁদ



মেডিকেলের ছাত্রী সুবর্ণা। রাতে ঘনিষ্ঠ বান্ধবী সাবিহা তাকে ফেসবুক মেসেঞ্জারে একটি নিউজ পোর্টালের লিঙ্ক পাঠিয়ে বলেছেন, ‘রান্নার রেসিপিটা দেখ। একেবারেই আলাদা।’ কৌতূহলি সুবর্ণা লিঙ্কে ক্লিক করতেই দেখলেন ফেসবুক হঠাৎ লগ আউট হয়ে গেছে। তিনি ভাবলেন, হয়তো কোথাও ভুল হচ্ছে। পুনরায় ফেসবুকের হোম পেজে ফোন নম্বর ও পাসওয়ার্ড টাইপ করেন। কিন্তু ফেসবুকে আর ঢুকতে পারেন না। কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই হ্যাক হয়ে গেল সুবর্ণার ফেসবুক অ্যাকাউন্ট! প্রিয় বান্ধবী এমন কাজ করতে পারল! রেগেমেগে সাবিহাকে ফোন করে কড়া কথা শোনাবেন। ফোন দিয়ে জানতে পারলেন ঘণ্টাখানেক আগে তার বান্ধবীর ফেসবুক আইডিটিও ছিনতাই হয়ে গেছে। তিনিও মহাবিপদে পড়েছে। একই কায়দায় হ্যাকার তার ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের ফাঁদে ফেলছে। আর বিকাশ নম্বর দিয়ে টাকা দাবি করছে।

মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ল সুবর্ণার। অজানা এক ভয় ঘিরে ধরল চারদিক থেকে। টাকার জন্য নয়, তার ভয় মেসেঞ্জারের ব্যক্তিগত আলাপ নিয়ে। ভালোবাসার মানুষটির সঙ্গে প্রতি রাতের কথোপকথনে কত আলোচনাই তো হয়েছে। কত ব্যক্তিগত মুহূর্তের আদান-প্রদান। এগুলো যদি হ্যাকারের হাতে পড়ে! সে যদি ছড়িয়ে দেয়! বুক কেঁপে ওঠে সুবর্ণার। নিঃশ্বাসের গতি বেড়ে যায়! ভালোবাসার মানুষটিকে সবকিছু জানালেন। সবাই নামলেন আইডি উদ্ধারে। কিন্তু হ্যাকার সুবর্ণা আর সাবিহার আইডিতে প্রবেশের সব তথ্য বদলে ফেলায় এবং ফেসবুকে কোনো রিকভারি মেইল বা ব্যাকআপ নম্বর না থাকায় কিছুতেই কিছু হলো না। আইডিটি আর উদ্ধার করা গেল না। ওদিকে হ্যাকার সুবর্ণা সেজে ফ্রেন্ডলিস্টের ঘনিষ্ঠজনদের জরুরি ভিত্তিতে বিকাশে টাকা চেয়ে মেসেজ পাঠাতে শুরু করেছে। এখন উপায়? দেশে ভুয়া লিঙ্কে ক্লিক করে আইডি হারানো এবং পরে হয়রানির শিকার হওয়ার এমন অভিযোগ বাড়ছে জ্যামিতিক হারে। চটকদার সংবাদের লিঙ্ক, প্রতিযোগিতায় বিজয়ী হতে ভোট চেয়ে অনুরোধ, চেহারা দেখতে কোনো তারকার মতো বা কার সঙ্গে বিয়ে হবে এমন উদ্ভট জরিপ, অনলাইনে বায়োমেট্রিক সিম নিবন্ধনের সুযোগসহ বিভিন্ন প্রলোভনে পড়ে ফেসবুক আইডি হারাচ্ছেন অনেকেই। দেশে প্রচলিত এ সাইবার ক্রাইমটিকে ‘ফিশিং’ বলে। মুহূর্তের অসতর্কতায় ফিশিংয়ের শিকার হয়ে ভয়ানক সব বিপদে পড়ছেন ফেসবুক ব্যবহারকারীরা। ফেসবুক আইডির দখল নিয়ে ব্যক্তিগত ছবি বা চ্যাট প্রকাশ করার ভয় দেখিয়ে হ্যাকাররা ভুক্তভোগীর কাছ থেকে টাকা আদায়ের পাশাপাশি অনৈতিক সম্পর্ক গড়ারও প্রস্তাব দিচ্ছে। মানসম্মান হারানোর ভয়ে ও পরিত্রাণের আশায় অনেকে আবার এমন কুপ্রস্তাবে রাজি হতেও বাধ্য হচ্ছেন। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এমন হ্যাকিং বা ব্ল্যাকমেইলিংয়ের শিকার হলে করণীয় পদক্ষেপগুলো সম্পর্কে সঠিক ধারণা না থাকায় এবং প্রচলিত আইনে ভিকটিমের জন্য কী কী সুরক্ষার ব্যবস্থা রাখা আছে তা জানা না থাকায় হ্যাকারের কাছে অসহায় আত্মসমর্পণ করে বসেন অধিকাংশ ভুক্তভোগী। কিন্তু এভাবে আত্মসমর্পণ বিপদ থেকে রক্ষা তো করবেই না উপরন্তু হ্যাকারকে আরও বেশি আত্মবিশ্বাসী করবে নতুন নতুন অনৈতিক দাবি করতে। মনে রাখা জরুরি, সামান্য অসুখ নীরবে সহ্য করে করে ক্যান্সার বাঁধানোর মানে হয় না। অনলাইনে বেচাকেনা নিয়েও ফাঁদ তৈরি করেছে প্রতারক চক্র। সম্প্রতি অনলাইনে জিনিসপত্র বেচাকেনা বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। অনেকেই সময় বাঁচানোর জন্য অনলাইনে জিনিসপত্র কেনেন। এ সুযোগটিই বেছে নেয় প্রতারকরা। আবার টাকা পরিশোধ না করে আগেই ক্রেতার ঘরে পণ্য পৌঁছে দিতে পত্রিকা ও টেলিভিশনে বিজ্ঞাপন দেয় তারা। ওইসব বিজ্ঞাপনে বলা হয়, পণ্য হাতে পেয়ে মূল্য পরিশোধ করা যাবে। এ রকম একটি পণ্য বিক্রির বিজ্ঞাপন দেখে রাজধানীর চানখাঁরপুলের ব্যবসায়ী মনিরুল হক চট্টগ্রামের ‘মধু অমৃত’ নামে ডায়াবেটিসের ওষুধ পেতে যোগাযোগ করেন। পরে একটি কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে তার কাছে ‘মধু অমৃত’ নামে ওষুধ পাঠিয়ে দেওয়া হয়। ওষুধের মূল্য বাবদ ৫ হাজার টাকা পরিশোধ করার পর তিনি প্যাকেটটি খুলে দেখেন কৌটার ভিতর বালু ভর্তি। এভাবে প্রতারিত হয়ে অসংখ্য ভুক্তভোগী র‌্যাবের কাছে অভিযোগ করেন।

র‌্যাব প্রতারক চক্রের এমন বেশ কয়েকজন সদস্যকে গ্রেফতার করেছে। র‌্যাব জানায়, অনলাইনে জিনিসপত্র বেচাকেনার কথা বলে ক্রেতা ও বিক্রেতার সঙ্গে তারা প্রতারণা করে আসছিল। প্রায় এক বছর ধরে প্রতারক চক্রটির হাতে অনেকেই দামি ল্যাপটপসহ মূল্যবান সামগ্রী খুইয়েছেন। ঢাকা মহানগর পুলিশের সাইবার ক্রাইম ইউনিটের প্রধান উপ কমিশনার মো. আলীমুজ্জামান বলেন, আইনে অপরাধের ধরন ও অপরাধীর শাস্তির বিধানের কথা বলা আছে। কিন্তু প্রতিকার পেতে গেলে আপনাকে এ আইনটি ব্যবহার করতে হবে বা আইনের আশ্রয় নিতে হবে। এ ক্ষেত্রে ঘটনার বিবরণ ও বিকাশ বা রকেটের যে নম্বর পাঠিয়ে টাকা দাবি করা হচ্ছে তা উল্লেখ করে নিকটস্থ থানায় জিডি করতে হবে। (ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ সম্প্রতি শহরের প্রতিটি থানার একজন ইন্সপেক্টর ও দুজন এসআইকে সাইবার অপরাধসংক্রান্ত বিশেষ ট্রেনিং দিয়েছে। ফলে ফেসবুক আইডি হ্যাকের ঘটনায় থানায় গিয়ে প্রতিকার চাইতে গেলে আগের মতো বিব্রত বা তুচ্ছতাচ্ছিল্যের শিকার হওয়ার সম্ভাবনা এখন কম।) থানা পুলিশ যদি পূর্ণ সহযোগিতা না করে অথবা ব্যর্থ হয় তবে জিডির কপি নিয়ে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের হেডকোয়ার্টারে অবস্থিত সাইবার ক্রাইম ইউনিটের সঙ্গে যোগাযোগ করা যেতে পারে। এ ছাড়া দেশের যে কোনো প্রান্ত থেকে পুলিশের ‘হ্যালো সিটি’ অ্যাপসের মাধ্যমে অভিযোগ দাখিল করলে প্রতিকার মিলবে। অভিযোগ দাখিলের পর তাড়াহুড়া না করে কয়েক দিন অপেক্ষা করতে হবে এবং নিয়মিত ফলোআপ করলে আপনি প্রতিকার পাবেন। কেননা সাইবার ক্রাইম ইউনিটের আছে অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি ও আন্তরিক বহু কর্মকর্তা। মনে রাখা জরুরি, অনলাইন জগতে একমুহূর্তের অসতর্কতা ভয়ানক সব বিপদ ডেকে আনতে পারে। ফলে অনলাইন জগতে সতর্ক থাকুন, যৌক্তিক আচরণ করুন এবং অপরাধের শিকার হলে নীরবে সহ্য না করে অবশ্যই প্রতিবাদ করুন।

শেয়ার করুন:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *