Tuesday, January 21

একাত্তরের এই দিনে ওসমানীনগরের বুরুঙ্গার মাটি রক্তস্নানে সিক্ত হয়েছেল



উজ্জ্বল দাশ::১৯৭১ সালের ২৬মে হারিয়ে যাওয়া বড়গঙ্গা নদীর পললভূমি ওসমানীনগরের বুরুঙ্গা রক্তস্নানেসিক্ত হয়েছেল। পাকবাহিনী ও তাদের দোসরদের নারকীয় তাণ্ডবে হিন্দু অধ্যুষিত বুরুঙ্গার অর্ধশতাধিক শান্তিপ্রিয় মানুষের রক্তে ভিজেছিল বুরুঙ্গা উচ্চ বিদ্যালয়ের সবুজ শ্যামল মাঠ । স্বাধীনতার দীর্ঘ ৪৭ বছরে ও সেদিনের তাণ্ডবে নিহতদের সংখ্যা সঠিকভাবে নির্ণয় করা সম্ভব হয়নি। এ ছাড়াও যেসব পাকবাহিনীন তাবেদার এ দেশীয় বিশ্বাস ঘাতক রাজাকারদের ইন্দনে সে দিনের নারকীয় হত্যাযজ্ঞ লুট-পাট হয়েছিল তাদেরকে বিচারের আওতায় আনা হয়নি। এই সব রাজাকারের বংশধররা নিজেদর খোলাস পাল্টিয়ে বর্তমানে দাপটের সাথে চলা ফেরা করছে!
সে দিনের নারকীয় হত্যাযজ্ঞঃ
২৫শে মে মঙ্গলবার বিকেলে বুরুঙ্গায় আতংক ছড়িয়ে পড়ে পাকিস্তানী এসেছে বাজারে। চারিদিকে দৌড় ঝাপ। স্থানীয় চেয়ারম্যান ইনজদ আলী লোক মারফত জানিয়ে দেন ভয়ের কিছু নেই। পাকিস্তানীরা খারাপ উদ্দেশ্যে আসেনি। বিকেল ৪টায় মিটিং বসে। চেয়ারম্যানের পক্ষ থেকে যেনো প্রতিটা গ্রামে জানিয়ে দেওয়া হয় আগামীকাল(২৬মে) বুরুঙ্গা উচ্চ বিদ্যালয়ে শান্তি কমিটি গঠন করা হবে। শান্তি কার্ড (ড্যাণ্ডি কার্ড) ধারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে পাকিস্তান সরকার। সবাই যেনো উপস্থিত থাকে। ঢেড়া পিঠিয়ে মেম্বার চৌকিদার পাঠিয়ে প্রতিটা গ্রামে জানিয়ে দেওয়া হলো মিটিং-এ সবার আসা বাধ্যতামূলক।
মৃত্যু ভয় নিয়েও অনেকে সকাল ৮টায় স্কুল মাঠে উপস্থিত হলেন। আস্তে আস্তে বুরুঙ্গা পার্শ্ববর্তী বিভিন্ন গ্রামের সহস্রাধীক লোক জড়ো হন। পাক হানাদার বাহিনীর ক্যাপ্টেন নূর উদ্দিনের নেতৃত্বে একদল পাকিস্তানী সেনা সকাল ৯টায় জীপে চড়ে বুরুঙ্গা উচ্চ বিদ্যালয়ে আসে। সেখানে পূর্বে তৈরী রাখা তালিকা অনুযায়ী সবার উপস্থিতি সম্পর্কে নিশ্চিত হয়। সকাল ১০ ঘটিকায় পাক বাহিনী মিটিং-এর কথা বলে স্কুল মাঠে সমবেত লোকদের মধ্যে হিন্দু-মুসলমানদের আলাদা করে। তারপর হিন্দুদের স্কুলের অফিস কক্ষে ও মুসলমানদের দক্ষিন দিকের একটি ক্লাস রুমে ঢুকিয়ে দেয়। মুসলমান প্রত্যেককে চার কলেমা পড়তে বলে। ১০-১২জন মুসলমানকে রেখে বাকীদের ছেড়ে দেওয়া হয়। তাদের নির্দেশ দেওয়া হয়, তারা যেনো নারায়ে তাকবির-আল্লাহু আকবার ও পাকিস্তান জিন্দাবাদ বলতে বলেতে এলাকা ত্যাগ করে। হিন্দুদের অনেকে ভয়ে কান্না শুরু করলে পাকবাহিনী ধমক দেয়। পাক বাহিনী প্রাণে মারার হুমকী দিয়ে সবাইকে কান্না থামানোর নির্দেশ দেয়। তারপর পাকবাহিনী বন্দি থাকা মুসলমাদের নির্দেশ করে ৪ জন করে হিন্দুকে এক সাথে বাঁধার। তখন গ্রামের প্রাক্তন চেয়ারম্যান বাদশা মিয়া বলেন, এটাতো ইসলামের বিধান না। হিন্দুদের এখানে দাওয়াত দিয়ে আনা হয়েছে। দাওয়াত দিয়ে এভাবে রশি দিয়ে বাঁধা কি ঠিক? পাকিস্তানীবাহিনীর ক্যাপ্টেন নূর উদ্দিন কখন বাদশা মিয়াকে প্রচণ্ড ধমক দেয়। ধমকে তিনি ভয় পেয়ে চুপ করে বসে থাকেন। তখনকার সময় সিলেট জর্জ কোর্টের প্রভাবশালী উকিল রাম রঞ্জন ভট্টাচার্য্যকে একটি চেয়ারে বসিয়ে রাখা হয়। রশি দিয়ে বাঁধার মুহূর্তে নিবাস চক্রবর্ত্তী নামের এক শিক্ষক কৌশলে ভবনের জানালা খুলে দিলে প্রীতি রঞ্জন চৌধুরী ও অধির মালাকার (রানু) নামের দুই জন জানালা দিয়ে পালিয়ে যান। পাক সেনারা তা দেখে বৃষ্টির মতো গুলি ছুঁড়ে। কিন্তু উভয়ই নিরাপদ দুরত্বে চলে যেতে সক্ষম হন। দুপুর ১২ টায় পাক সেনারা সবাইকে ভবন থেকে মাঠে এনে লাইনে দাঁড় করায়। সামনের দিকে ৩টি এলএমজি প্রস্তুত করা হয়। ক্যাপ্টেন নূর উদ্দিন উপস্থিত সবাইকে বলে, তোমরা মুজিব বাহিনীর দালাল। তোমাদের কি করবো তোমরাই বলো! বুরুঙ্গার আহাদ চৌধুরী(গৌছ রাজাকার),নিজ করনসী গ্রামের আব্দুল আহাদ (ছাদ মিয়া),রুস্তুম উল্লা ছোট হাজীপুরের আব্দুল খালিক,কালা মৌলভী-ধলা বান্দরসহ রাজাকাররা তখন নূর উদ্দিনকে বলে, স্যার এরাই সবাই মুজিবের সমর্থন, এদের বাঁচিয়ে রেখে লাভ নেই। পাক বাহিনীর ক্যাপ্টেন নূর উদ্দিন ইশারা করতেই এলএমজি গুলো এক সাথে গর্জে উঠে। মুহূর্তেই ঝড়ে যায় ৭৮টি তাজাপ্রাণ। তাদের রক্তে বুরুঙ্গার সবুজ স্কুল মাঠ রঞ্জিত হয়ে উঠে। পাক বাহিনী গুলি করার পরও এদের মৃত্যু সম্পর্কে নিশ্চিত হতে না পেরে বুরুঙ্গা বাজার থেকে ২টিন কেরোসিন এনে লুটিয়ে পড়া সবার উপর কেরোসিন ঢেলে আগুন লাগিয়ে দেয়। আহতদের আর্তচিৎকার আর মানুষ পোড়া গন্ধে বাতাস ভারী হয়ে উঠে। বসিয়ে রাখা রাম রঞ্জন ভট্টাচার্য্যকে বলা হয় আপনি চলে যান। চেয়ার থেকে উঠে বাড়ীর পথ ধরতেই তাকে পেছন দিক থেকে গুলি করা হয়। তিনিও ঘটনাস্থলে মৃত্যু বরণ করেন। পুরুষদের আর্তচিৎকারে চারিদিক যখন প্রকম্পিত গৌছ রাজাকার ছাদ মিয়া,রুস্তুম উল্লা(রুস্তুম চৌকিদার) ছোট হাজীপুরের আব্দুল খালিক,শেরপুরের কালা মৌলভী-ধলা বান্দরসহ আট-দশজন পাকিস্তানী তাবেদার এ দেশীয় বিশ্বাস ঘাতক রাজাকার তখন ব্যাস্ত গ্রামের পর গ্রাম লুটপাট ও নারী নির্যাতনে। প্রায় ১ঘন্টা তাণ্ডব চালিয়ে উল্লাস করতে করতে পাকিস্তানী বাহিনী ও রাজাকাররা বুরুঙ্গা ত্যাগ করে।
সে দিনের হত্যাযঞ্জে আত্মহুতি দিয়েছিলেন যারাঃ
রাম রঞ্জন ভট্রাচার্য, সমরজিৎ চক্রবর্তী,নিকুঞ্জ বিহার চক্রবর্তী, নিত্য রঞ্জন চক্রবর্তী, বিশ্বতোষ চক্রবর্তী, দূর্গাপদ আচার্য , যোগেশ চন্দ্র দেব,রজনী কান্ত দেব,যতীন্দ্র কুমার দেব, রেবতী মোহন দত্ত, রনজিত মোহন দেব, গজেন্দ্র কুমার সেন, সুখরায শুক্ল বৈদ্য, দীগেশ শুক্ল বৈদ্য, হরি চরন শুক্ল বৈদ্য, সুধির শুক্ল বৈদ্য, কিরন রায় শুক্ল বৈদ্য, নিরোদ রাম শুক্ল বৈদ্য, নিরাময় শুক্ল বৈদ্য, রমন চন্দ্র দাশ, অশ্বিনী কুমার দেব, শুনীল মালাকার,ঘুর মালাকার, ছাঞ্জন সূত্রধর,চিত্ত রঞ্জন মালাকার,রবীন্দ্র শব্দকর,আহদ শব্দকর,ময়না শব্দকর,বেনুরাম শব্দকর, দুলাল শব্দকর, দ্বারিবন নমশুদ্র, নোনামনি নমশুদ্র, বিহারী নমশুদ্র,সদয় নমশুদ্র, অক্ষয় নমশুদ্র, মুরই নমশুদ্র,মহেন্দ্র শব্দকর,হরকুমার শব্দকর,চরেশ শব্দকর, রাজেন্দ্র ধর, রাখাল ধর, শ্যামা ধর, গনেশ ধর, সতীশ দেব, নিরঞ্জন দাশ, অভিমন্য দেব, যতীন্দ্র দেব, গোপেন চন্দ্র দেব, আনন্দ চন্দ্র দেব, শ্যামা চন্দ্র দেব, নিহারী চন্দ্র দেব, ধীরেদ্র চন্দ্র দেব, সুনীল চন্দ্র দেব, গঙ্গেশ চন্দ্র দেব, পুলিশ চন্দ্র দেব, অশ্বিনী দাশ, ব্রজেন্দ্র কুমার দাশ, মাহন্ত নমশুদ্র,নন্দলাল পাল,পরেশ চন্দ্র দেব।বুরুঙ্গা উচ্চ বিদ্যালয়ের মাঠে পাকসেনাদল একত্রে ৭৮ জন কে হত্যাকরে । এর মধ্যে ৬০ জনের পরিচয় পাওয়া গেলেও অদ্যাবদি বাকী ১৮ জনের পরিচয় নির্নয় করা সম্ভব হয়নি।

শেয়ার করুন:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *