Friday, January 24

একাত্তরের সমর নায়কের বাড়িতে নেই কোনো নাম ফলক!



উজ্জ্বল দাশ:: ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের দু’পাশেই ওসমানীনগর উপজেলাধিন দয়ামীর বাজার। এই বাজার থেকে রাস্তার পূর্বদিকে চলে যাওয়া আধাপাকা সড়কটি ধরে পাঁচমিনিট হাঁটলেই চোখে পড়বে হলদে রঙের প্রাচীর ঘেঁরা একটি বাড়ি। এই বাড়িই মহান মুক্তিযুদ্ধের সমর নায়ক বঙ্গবীর মোহাম্মদ আতাউল গণি ওসমানীর (এমএজি ওসমানী) পৈত্রিক ভিটা। কিন্তু বাড়িটি দেখে বোঝার কোনো উপায় নেই, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের প্রধান সেনাপতির বাড়ি এটি।
নেই কোনো নাম ফলক কিংবা সাইনবোর্ড; এমনকি ওসমানীর একখানা ছবিও। তাই কোনো আগন্তুককে ওসমানীর বাড়ি দেখতে গিয়ে ধান্দাতেই পড়তে হয়।
১৯১৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর সুনামগঞ্জে জন্ম হলেও বঙ্গবীর ওসমানীর পৈতৃক বাড়ি ওসমানীনগর উপজেলার (তৎকালীন বালাগঞ্জ) দয়ামীরে। ওসমানীর বাবা তৎকালীন সুনামগঞ্জ সদর মহকুমার সাব-ডিভিশনাল অফিসার খান বাহাদুর মফিজুর রহমান বাড়ির পাশেই তার বাবা আবদুস সুবাহানের নামে প্রতিষ্ঠিত করেন প্রাথমিক বিদ্যালয়।
নারী শিক্ষার প্রসারে ১৯২৯ সালে একমাত্র মেয়ের নামে গড়ে তুলেন সদরুন্নেছা উচ্চ বিদ্যালয়। যা কিনা ওই এলাকায় শিক্ষার আলো ছড়িয়ে যাচ্ছে।
চিরকুমার বঙ্গবীর ওসমানীর বাড়িতে তার কোনো উত্তরসূরী না থাকলেও নিয়মিত থেকে ঘর-দোর দেখভাল করেন কমর উদ্দিন।
তিনি জানান, বাড়িতে তেমন কেউ আসেন না। ওসমানীর বংশধরেরা বড় চাকরি করেন। অনেকেই ইংল্যান্ডে থাকেন। বিভিন্ন উৎসবে বাড়িতে বেড়াতে এলেও চলে যান, থাকেন না কেউ। বাড়ি তদারকির দায়িত্বে থাকা ছফুর আলীও সিলেট শহরে থাকেন।বর্ণনা বলতে ওসমানীর পৈতৃক বাড়িটির আদি কোনো অবকাঠামো নেই। সংস্কার করে সেখানে নতুন ভবন নির্মাণ করা হয়েছে। ৪৩২ শতাংশ (১২ কের=৩৬ শতাংশ=এক কের) জমির ওপর নির্মিত বাড়িটির চারপাশে দেয়াল ঘেরা।
ভেতরে রয়েছে তিনটি ভবন, সামনে তিনটি দিঘী। যেনো দিঘীর শান্ত জলের মতোই নিজ ‘বাসভূমে’ নীরবে রয়ে যাচ্ছে ওসমানীর স্মৃতি। আর গেটের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া খালটিকে বাড়ির অংশে দু’ধারে পাকা করে দেওয়া হয়েছে। যেটি চলে গেছে পাশের হাওরে।
আলাপের ফাঁকে ফাঁকেই ঘুরে বাড়িটির দ্বিতল ঘর দেখালেন কেয়ারটেকার কমর উদ্দিন। মূল ভবন থেকে একটু দূরে রয়েছে আরও দু’টি ভবন। যেগুলো বাড়িতে এলে ব্যবহার করেন ওসামানীর উত্তরসূরীরা। আর গেটের পাশে ছড়ার ধারে ঘরটিতে ছেলে-মেয়ে ও পরিবার নিয়ে থাকেন কমর উদ্দিন। তার বাড়ি সুনামগঞ্জের জামালগঞ্জে, একযুগ ধরে বাড়িটির দেখাশোনা করেন তিনি।
আলাপচারিতায় কমর জানান, ওসমানীর পৈতৃক জমি-জমা বিক্রি করে এ বাড়িটি নির্মাণ করা হয়েছে। রক্ষণা-বেক্ষণের খরচও তার কোনো বংশধররা দেন না। এখানকার শস্য কিংবা ফল-ফলাদি দিয়ে যা হয় তা দিয়েই চলে।
বাড়ির কোনো নাম ফলক কিংবা পরিচিতির বিষয়ে কমর উদ্দিনের ভাষ্য, ‘ছবি তোলার নিষেধ আছে। তবে কেন জানি না, বলতে পারি না নাম ফলকের বিষয়ে কিছু জানি না।’
পৈতৃক ভিটায় বঙ্গবীর ওসমানীর কোনো স্মৃতিরই দেখা মিলেনি। দীর্ঘদিন ক্যান্সারের সঙ্গে লড়াই করে ১৯৮৪ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি লন্ডনে মারা যাওয়ার পর তার মরদেহ দাফন করা হয় হজরত শাহজালাল (র.) এর মাজার সংলগ্ন কবরস্থানে।
‘এ বাড়িতে ওসমানী সাহেবের ব্যবহৃত ছবি কিংবা অন্য কোনো জিনিসপত্র নেই। যা আছে সিলেট নগরে তার বাড়িতে প্রতিষ্ঠিত জাদুঘরেই রাখা হয়েছে,’ বলেন কমর উদ্দিন।
প্রবীন সাংবাদিক ও দয়ামীর আং ছোবহান সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পরিচালনা কমিটির সভাপতি বদরুল আলম চৌধুরী বলেন, বঙ্গবীর এমএজি ওসমানীর স্মৃতি বিজড়িত দয়ামীরের এ বিদ্যালয়গুলোর শিক্ষার্থীরাও মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়কের আদর্শে বেড়ে ওঠছে। কিন্তু বঙ্গবীর ওসমানীর বাড়িতে নাম ফলক কিংবা তাঁর কোন ছবি না থাকার কারনে বাড়ি দেখতে আসা পর্যটকদের হিমসিম খেতে হয়। স্থানীয়দের সহযোগীতায় ওসমানীর বাড়ির সন্ধান পেলেও অন্য এলাকা থেকে আসা লোকজনদেও দ্বিধায় পড়তে হয়। বঙ্গবীর এমএজি ওসমানীর বাড়ির সামনে নাম ফলক কিংবা ছবি অংকিত করা এটা সময়ের দাবী।

শেয়ার করুন:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *