Friday, January 24

কুশিয়ারা ডাইকের স্থানে স্থানে ভাঙন বালাগঞ্জ-ওসমানীনগরে বন্যা পরিস্থিতির অবনতি



শিপন আহমদ:: 
টানা বৃষ্টিপাতের কারণে কুশিয়ারা নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়ে কুশিয়ারা ডাইকের স্থানে স্থানে ভাঙন দেখা দিয়েছে। এতে সিলেটের ওসমানীনগর ও বালাগঞ্জ উপজেলার নদীর পারের বাসিন্ধারা আতংকে দিন কাটাচ্ছেন। বাঁধ ভেঙ্গে লোকালয়ে পানি প্রবেশ করে ইতিমধ্যে পানিবন্দি হয়ে মানবেতর জীবন-যাপন করেছেন দুই উপজেলার প্রায় দুই শতাধিক গ্রামের লক্ষাধিক লোকজন। গত দুই দিন ধরে নতুন করে ওসমানীনগরের গোয়ালাবাজার ইউনিয়নের ৯ নং ওয়ার্ডের মুতিয়ার গাঁও, কলারাই, ভাগলপুরসহ ওই ইউনিয়নের বেশ কয়েকটি গ্রাম প্লাবিত হচ্ছে। তবে ইতিমধ্যে বন্যায় আক্রান্ত ওসমানীনগরের সাদীপুর, উমরপুর, পশ্চিম পৈলনপুর, বালাগঞ্জের সদর ও পূর্ব পৈলনপুর ইউনিয়নে সরকারী ভাবে ত্রাণ বিতরণ কার্যক্রম চালু হলেও গোয়ালাবাজার ইউনিয়নের বানভাসী লোকজন কোন ত্রাণ সামগ্রী পাচ্ছে না। রবিবার বিকালে সিলেট জেলা আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক সাবেক এমপি আলহাজ্ব শফিকুর রহমান চৌধুরী, সিলেটের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা ও আইসিটি) আবু সাফায়াত মুহম্মদ সাহে-দুল ইসলাম, পানি উন্নয়ন বোর্ড সিলেটের নির্বাহী প্রকৌশলী সিরাজুল ইসলাম, ওসমানীনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো.আনিছুর রহমান ও উপজেলা প্রকল্প বাস্থবায়ন কর্মকর্তা হাবিবুর রহমান ভাঙ্গন কবলিত একাধিক এলাকা পরিদর্শন করেছেন। এদিকে গত কয়েক দিনের টানা বর্ষনে কুশিয়ারা নদীর তীর ঘেঁষা বালাগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে সম্মুখের রাস্তা, বালাগঞ্জ বাজারে ভিতরের রাস্তা, বালাগঞ্জ ডিএন মডেল উচ্চ বিদ্যালয়ের মাঠ, তয়রুন নেছা বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের ভিতরে প্রবেশের রাস্তা ও মাঠ, ইউআরসি অফিসের রাস্তা, উপজেলা প্রশাসনের মূল সড়ক ও উপজেলা প্রশাসনের মাঠ পানিতে ডুবিয়ে গেছে এবং উপজেলা প্রশাসনিক ভবনের নিচতলার অফিসগুলোর ভিতরে পানি প্রবেশ করেছে।গতকাল সোমবার বালাগঞ্জে বন্যা কবলিত গ্রামগুলোতে সরকারীভাবেও চাল বিতরণ করা হয়েছে। পানিবন্দি মানুষদের মধ্যে গত দুদিন ধরে বালাগঞ্জ উপজেলা চেয়ারম্যান আলহাজ্ব আব্দাল মিয়ার ব্যাক্তিগত পক্ষ থেকে নগদ সহায়তা প্রদান করা হচ্ছে।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, উজান থেকে আসা পাহাড়ি ঢলে নির্মানাধীন বালাগঞ্জ-খসরুপুর সড়কের (প্রকাশিত কুশিয়ারা ডাইক) একাধিক স্থানে ভাঙন দেখা দিয়েছে। ইতিমধ্যে এই সড়কের বালাগঞ্জ সদর ইউনিয়নের করছারপার, রাধাকোনা, পূর্ব পৈলনপুর ইউনিয়নের ফাজিলপুর, হামছাপুর, জালালপুর ও ওসমানীনগরের সাদিপুর ইউনিয়নের কুশিয়ারা ডাইকের লামা তাজপুর এলাকাসহ একাধিক স্থান ভাঙন আক্রান্ত হয়েছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের সহযোগীতায় স্থানীয়রা কুশিয়ারা ডাইকের ওসমানীনগরের লামা তাজপুরস্থ ভাঙন আক্রান্ত স্থানে বালু ভর্তি বস্তা দিয়ে বাঁধ বাঁধ সংস্কার কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। কুশিয়ারা নদীর পানি বিপদ সীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় নদী তীরবর্তী ওসমানীনগর উপজেলার লামা তাজপুর, পূর্ব তাজপুর, দক্ষিণ তাজপুর ও চর গাঁওয়ের দুই সহস্রসাধিক পরিবার ৪-৫ দিন ধরে পানিবন্দি অবস্থায় রয়েছেন। এসব গ্রামের ৯০ শতাংশ পরিবার দরিদ্র। পানিবন্দি হওয়ায় তাদের ঘরে খাবার নেই। বিশুদ্ধ পানির অভাব থাকায় পানিবাহিত রোগে আক্রান্ত হওয়ায় সম্ভাবনাও দেখা দিয়েছে। সাদীপুর ইউপি সদস্য স্বপন আহমদ, আলেয়া বেগম বলেন, কুশিয়ারায় পানি বৃদ্ধি এবং ডাইক ভেঙ্গে এলাকার প্রায় ২৫টি গ্রামের ৩ সহস্রাধিক পরিবার পানিবন্দি অবস্থায় রয়েছে। পানিবন্দি গরীব পরিবার গুলোর জন্য ত্রাণ বরাদ্ধ দেয়ার দাবি জানান তারা।
তথ্যানুসন্ধানে জানা গেছে, ওসমানীনগরবাসীকে বন্যার হাত থেকে বাঁচানোর জন্য তৈরী করা হয়েছিল কুশিয়ারা ডাইক। গত শুক্রবার রাতে হঠাৎ করে লামা তাজপুর এলাকায় কুশিয়ারা ডাইকের অন্তত ৫০-৬০ ফুট জায়গা ভেঙ্গে গিয়ে সাদীপুরসহ আশ পাশের একাধিক ইউনিয়নের শতাধিক গ্রামকে বন্যা ঝুঁকিতে ফেলেছে। ইতিমধ্যে সুরিকোণা, ইসলামপুর, কালনীরচর, সুন্দিখলা, সম্মানপুরসহ সাদীপুর ও গোয়ালাবাজার,উমরপুর ও পশ্চিম পৈলনপুর ইউনিয়নের অধিকাংশ গ্রাম বন্যা কবলিত হয়ে পড়েছে। এতে দূর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে অর্ধলক্ষাধিক অধিবাসীকে। কাজে অনিয়ম ও দূর্নীতির কারণে প্রায় প্রতিবছরই ডাইকে ভাঙ্গন দেখা দেয়। ২০১৬ ও ১৭ সালে ডাইকের ওসমানীনগরের সাদীপুর ইউনিয়নের লামা তাজপুর এলাকায় স্থানে স্থানে ভাঙ্গন দেখা দিলে শীত মৌসুমে পানি উন্নয়ন বোর্ডের তালিকাভুক্ত ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের মাধ্যমে সংস্কার কাজ করানো হয়। কিন্তু যতটুকু উচ্চতায় মাটি ভরাট করার কথা ছিল তা করা হয়নি। ফলে প্রতিবারের ন্যায় এবারও ডাইকে ভাঙ্গনসহ একাধিক স্থানে ডাইকের উপর দিয়ে পানি ভিতরে ঢুকতে দেখা যাচ্ছে। ডাইক সংশ্লিষ্ট এলাকার একাধিক বাসিন্দারা জানান, ডাইকের সংস্কার কাজে গাফলাতি, অনিয়মসহ প্রভাবাশালী কর্তৃক কুশিয়ারা নদী থেকে অপরিকল্পিত ভাবে ড্রেজার মেশিন দিয়ে বালু উত্তোলণের ফলে প্রতিবছর আমাদের এ দূভোগ পোহাতে হচ্ছে। এ ব্যাপারে আমরা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ দিয়ে কোন কাজ হয় না।
গোয়ালাবাজার ইউনিয়নের সদস্য মনির উদ্দিন বলেন, গত দুই দিনের বন্যায় আমার ওয়ার্ডের সবগুলো গ্রামের বাসিন্দারা পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। পানিবন্দি মানুষের মধ্যে দূর্ভোগও বাড়ছে।
ওসমানীনগর উপজেলা নির্বাহী মো: আনিছুর রহমান বলেন, ভাঙ্গন কবলিত স্থান পরিদর্শন করেছি। পানিবন্দি অসহায় পরিবারের মধ্যে ত্রাণ কার্যক্রম চালু করা হয়েছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের উদ্যোগে কুশিয়ারা ডাইকের আক্রান্ত এলাকায় বালির বস্তা ফেলে সংস্কার কাজও শুরু হয়েছে।
বালাগঞ্জ উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আবদাল মিয়া বলেন, পানি বৃদ্ধিতে কুশিয়ারা ডাইকের বিভিন্ন স্থানে ভাঙন দেখা দিয়েছে। ইউএনও সাহেবকে নিয়ে আমরা আক্রান্ত এলাকা পরিদর্শন করছি। উপজেলার পূর্ব পৈলনপুর, বালাগঞ্জ সদর ইউনিয়নের সবকটি গ্রাম প্লাবিত হওয়ায় এসব গ্রামের বাসিন্দারা পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। পানিবন্দি মানুষদেরকে সহায়তা প্রদানে সংশ্লিষ্ট সকলকে আহবান করেন তিনি।
উপজেলা প্রকল্প বাস্থবায়ন কর্মকর্তা হাবিবুর রহমান জানান, টানা বৃষ্টিপাত ও উজান থেকে আসা পাহাড়ি ঢল ও কুশিয়ারা ডাইকে ভাঙ্গন দেখা দেয়ায় বালাগঞ্জ ও ওসমানীনগর উপজেলা একাধিক ইউনিয়ন বন্যা আক্রান্ত হচ্ছে। পানি বৃদ্ধির কারনে প্রতিদিন নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হচ্ছে। আমরা দ্রুত প্লাবিত এলাকাগুলোর তালিকা তৈরী করে উধ্ধতন কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি অবগত করছি। ইতিমধ্যে দুই উপজেলার বন্যাকবলিত ইউনিয়নগুলোতে সরকারী ভাবে চাল বিতরণ করা হচ্ছে।

শেয়ার করুন:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *