Tuesday, January 28

“প্রতিটি দুঃসময়ে পাশে ছিল ভারতবাসী”



আসানসোলে কাজী নজরুল বিশ্ববিদ্যালয়ে গতকাল সমাবর্তন অনুষ্ঠানে সম্মানসূচক ডি.লিট ডিগ্রি গ্রহণ করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। গণতন্ত্র, নারীর ক্ষমতায়ন ও জনগণের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয়টি তাঁকে এই ডিগ্রি প্রদান করে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ডক্টর অব লিটারেচার (ডি.লিট) ডিগ্রি দিয়েছে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের কাজী নজরুল বিশ্ববিদ্যালয়। গণতন্ত্র, নারীর ক্ষমতায়ন, দারিদ্র্য বিমোচন এবং আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন থেকে জনগণের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে তাঁকে এ ডিগ্রি দেওয়া হয়। প্রধানমন্ত্রী গতকাল শনিবার সকালে পশ্চিমবঙ্গের আসানসোলে বিশ্ববিদ্যালয়টির বিশেষ সমাবর্তন অনুষ্ঠানে সম্মানসূচক ওই ডিগ্রি গ্রহণ করেন।

এরপর প্রধানমন্ত্রী তাঁর বক্তৃতায় পুরো উপমহাদেশকে দারিদ্র্যমুক্ত, ক্ষুধামুক্ত, উন্নত ও সমৃদ্ধিশালী হিসেবে গড়ে তোলার এবং প্রতিবেশীদের সঙ্গে এ বিষয়ে কাজ করার আগ্রহ প্রকাশ করেন। একই সঙ্গে তিনি সারা বিশ্বে হানাহানি, সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদ, মাদক থেকে যুবসমাজকে রক্ষার ডাক দেন। কবি নজরুলের অসাম্প্রদায়িক চেতনায় বাংলাদেশ গড়ে তোলা ও পরিচালনা করার কথা উল্লেখ করে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ওই চেতনা নিয়ে চলার আহ্বান জানান। প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশের এবং নিজের জীবনের বিভিন্ন ঘটনার উদাহরণ দিয়ে বলেন, প্রতিটি দুঃসময়ে ভারতবাসী এ দেশের পাশে ছিল।

বাংলাদেশের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের নামে ভারতের বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সম্মাননা গ্রহণকে সৌভাগ্যের বিষয় হিসেবে উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী। তাঁকে দেওয়া ওই সম্মান তিনি বাংলাদেশের জনগণ ও প্রত্যেক বাঙালিকে উৎসর্গ করেন। শেখ হাসিনা বলেন, ‘অনেক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উপাধি ও সম্মান পেয়েছি। আরো অনেক প্রস্তাব আছে। কিন্তু এখন সময় করে উঠতে পারি না। যখন নজরুল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রস্তাব পেয়েছি তখন আমি আমার আকাঙ্ক্ষাকে আর দমন করতে পারিনি। আমি ছুটে এসেছি আপনাদের কাছে। আপনাদের ভালোবাসা, স্নেহ সব সময় আমাদের মনে থাকবে।’

শেখ হাসিনা বলেন, ‘বাংলা ভাগ হতে পারে। কিন্তু নজরুল, রবীন্দ্রনাথ ভাগ হয়নি। তারা সবার, দুই বাংলার।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘কবি নজরুল অসাম্প্রদায়িক চেতনায় বিশ্বাস করতেন। মানবতার প্রতি তাঁর বাণী প্রতিনিয়ত আচরণ ও বচনে প্রতিফলিত হয়েছে তাঁর লেখনীর মধ্য দিয়ে। তিনি ইসলামের বাণী হামদ-নাতের মাধ্যমে সহজ বাংলা ভাষায় সাধারণ মানুষের কাছে নিয়ে গেছেন। সেই সঙ্গে তিনি শ্যামাসংগীত, কীর্তন, বৈষ্ণবগীতি রচনা করে হিন্দুধর্মের বাণী পর্যন্ত পৌঁছে দিয়েছেন সাধারণ মানুষের মধ্যে। এই ধরনের বিরল প্রতিভা খুব কম দেখা যায়।’

কবি নজরুলের সঙ্গে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের চেতনাগত সাদৃশ্যের কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, নিপীড়িত-নির্যাতিত মানুষের কথা বলা ও লেখার কারণে তাঁদের দুজনকেই কারাগারে যেতে হয়েছে। কিন্তু তাঁরা কেউই দমে যাননি। তিনি বলেন, ‘একদিকে কাজী নজরুল ইসলাম আমাদের বাংলা সাহিত্যের কবি, অন্যদিকে বঙ্গবন্ধু আমাদের রাজনীতির কবি।’

কবি নজরুলের সাহিত্য থেকে বঙ্গবন্ধু ঐতিহাসিক ‘জয় বাংলা’ স্লোগান গ্রহণ করেছিলেন বলে জানান প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘ভারতে সব সময় গণতান্ত্রিক ধারা ছিল ও আছে। এমন সৌভাগ্য বাংলাদেশিদের হয়নি। গণতান্ত্রিক ধারার কারণে ভারতবাসী হয়তো আজ অনেক উন্নত জীবন পেয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশিদের জীবনে এসেছে বারবার আঘাত।’

মুক্তিযুদ্ধ এবং যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশ পুনর্গঠনে ভারত সরকার ও তৎকালীন ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর অবদানের কথা স্মরণ করে শেখ হাসিনা বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধের সময় এক কোটি বাঙালি শরণার্থী ভারতে আশ্রয় নিয়েছিল। ভারতবাসী তাদের সঙ্গে খাদ্য ভাগ করে খেয়েছে। তারা অনেক ত্যাগ স্বীকার করেছে। আমরা কৃতজ্ঞতা জানাই ভারতবাসীর প্রতি। আমাদের দুঃসময়ে তারা পাশে দাঁড়িয়েছিল।’

স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার মাত্র সাড়ে তিন বছরের মাথায় বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘মিসেস গান্ধী আমাদের দুই বোনের খবর নিয়েছিলেন। আমাদের নিয়ে এসেছিলেন জার্মানি থেকে। আশ্রয় দিয়েছিলেন।’ প্রধানমন্ত্রী আরো বলেন, ‘আমাদের প্রতিটি দুঃসময়ে আমরা ভারতবাসীকে পেয়েছি। কাজেই আমাদের কৃতজ্ঞতা আপনাদের কাছে।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের অনেক সমস্যা ছিল। সেগুলো সমাধান করা হয়েছে এবং করা হচ্ছে। সমস্যার পাশাপাশি মানবকল্যাণের কথা ভাবারও তাগিদ দেন প্রধানমন্ত্রী।

মানবতার কারণে মিয়ানমারের প্রায় ১১ লাখ রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দেওয়ার কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী এ সমস্যার দ্রুত সমাধান প্রত্যাশা করেন। হানাহানি, সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদ ও মাদক থেকে যুবসমাজকে রক্ষা এবং তাদের সুন্দর, অর্থবহ ও উন্নত জীবনযাপন নিশ্চিত করতে প্রধানমন্ত্রী প্রতিবেশী দেশগুলোর সহায়তা প্রত্যাশা করেন।

প্রধানমন্ত্রী গতকাল নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর স্মৃতিবিজড়িত জাদুঘর পরিদর্শন করেন।

পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় গতকাল সন্ধ্যায় প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে তাঁর হোটেল কক্ষে সাক্ষাৎ করেন। দুই দিনের সফর শেষে প্রধানমন্ত্রী গত রাতে ঢাকায় ফিরেছেন।

শেয়ার করুন:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *