Monday, January 20

সৌদি আরব থেকে কেন ‘মানসিক ভারসাম্যহীন’ হয়ে ফেরেন তারা?



সম্প্রতি সাতক্ষীরার এই নারী দেশে ফিরেছেন। তবে নিজের বাড়িতে নয়, তার স্থান হয়েছে ঢাকায় মানসিক হাসপাতালে। কারণ ৩২ বছর বয়সী খোদেজা দেশে ফিরেছেন মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে।

গৃহকর্মীর কাজ নিয়ে সৌদি আরবে গিয়ে নানা নির্যাতনের শিকার হয়ে দেশে ফেরা নারীদের খোঁজ-খবর নিতে গিয়েই জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইন্সটিটিউট ও হাসপাতালে দেখা মেলে খোদেজার। সঙ্গে রয়েছেন তার মা আর ছোট ভাই।

দেখা গেল অপ্রাসঙ্গিক সব কথা বলছেন খোদেজা। সুস্থ খোদেজা কেন ফিরলেন অসুস্থ হয়ে? চেষ্টা চলে প্রশ্নের উত্তর খোঁজার।

ভাই আফজাল বলেন, “এইডা কীভাবে বলব, তার কাছে না শুনলে তো কিছু বলতে পারব না যে কী হইছে। ও তো কিছুই বলতি পারছে না। খালি ভুল বকছে। বলছিল যে, পানির সঙ্গে ওষুধ খাওয়াইছে কিনা, ইনজেকশন দিছে। তাই বলছে খালি।”

সৌদি আরবে যাওয়ার পর খোদেজার সাথে তার পরিবারের সবশেষ কথা হয়েছিল দুই মাস আগে। তখন বলেছিলেন, ‘ভালোই’ আছেন।

আফজাল জানান, এরপর বোনের সাথে কথা হয় দেশে ফিরলে, ‘মানসিক ভারসাম্যহীন’ অবস্থায়। মাঝখানের সময়টায় কী হয়েছিল, তার কোনো উত্তর নেই।

“এখানে আসার পরে তো আর কতা, ভালো কতা হয়নি। খালি ভুল বকছে। কতা বলতি গেলিই তো ভুল বকছে, আর বলছে কেউ আমার সাথে কতা বলিস না। আমি মা-বাপ সব মাইরি ফেলিছি। বিভিন্ন রকম কতা বলচে।”

খোদেজার চিকিৎসার দায়িত্বে থাকা সহযোগী অধ্যাপক হেলাল উদ্দিন আহমেদ বলেন, “তিনি একদম মানসিক ভারসাম্যহীন অবস্থায় আছেন। অন্যকে সন্দেহ করছেন।…. কথাও এলোমেলো বলছেন। যেটাকে আমরা আমাদের ভাষায় বলে থাকি ‘ব্রিফ সাইকোসিস’, মানে হচ্ছে সাময়িক সময়ের জন্য ভারসাম্যহীনতা। এটা থেকেও যেতে পারে, আবার অনেক সময় দীর্ঘ মেয়াদীও হতে পারে।”

কিন্তু খোদেজার এই ‘ব্রিফ সাইকোসিস্টের’ পেছনের কারণ জানা গেছে কি না- এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “এখন পর্যন্ত আমরা যা পেয়েছি, তীব্র মানসিক চাপ তার ওপর ছিল। কর্মক্ষেত্রে এক ধরনের মানসিক চাপ তিনি অনুভব করতেন এবং সেই চাপটিকেই আমরা সবচেয়ে বড় কারণ বলে মনে করছি।”

সৌদি আরবে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হওয়ার কথাও বলেন এই চিকিৎসক।

“ফিজিক্যাল যে এবিউজগুলো বলছেন, খুব সিগনিফিকেন্ট নয়। মানসিক চাপটা অত্যন্ত বেশি ছিল। মানসিকভাবে একটা ভীতি, উৎকণ্ঠা, ত্রাস, আতঙ্কের মাঝে তিনি কাটাতেন এবং সেটা পরবর্তীতে তাকে এক ধরনের আতঙ্কগ্রস্ত করে তোলে।”

খোদেজার মতোই তিন মাস আগে মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফিরে এসেছেন নরসিংদীর ত্রিশোর্ধ্ব মনোয়ারা (ছদ্মনাম)।

তার ছোট ভাই লোকমান  বলেন, “টেনশন করত। আর জিজ্ঞাসা করলে বলে মাইরধর করত। আর কিছু বলে না। ডাক্তার বলছে, ব্রেনে সমস্যা।

লোকমান জানান, স্থানীয় একজন চিকিৎসকের কাছে বোনের চিকিৎসা করিয়েছেন। তবে এখনও পুরোপুরি সুস্থ হননি ১২ বছরের এক কন্যা সন্তানের মা মনোয়ারা।

অভিবাসন নিয়ে কাজ করা বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাকের তথ্য অনুযায়ী, গত তিন মাসে এমন ছয়জন ‘মানসিক ভারসাম্যহীন’ গৃহকর্মী ফিরেছেন সৌদি আরব থেকে।

কিন্তু সুস্থ অবস্থায় সৌদি আরবে যাওয়া নারী গৃহকর্মীরা কেন ‘মানসিক ভারসাম্যহীন’ হয়ে দেশে ফিরে আসছেন, তার কোনো সঠিক কারণ উদঘাটন করা যাচ্ছে না।

ব্র্যাকের মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের প্রধান শরিফুল হাসান জানিয়েছেন, গত দুই মাসে যে ছয় জন দেশে ফিরেছে, তাদের ‘মানসিক ভারসাম্যহীন’ হওয়ার কারণ খোঁজার চেষ্টা করেছে ব্র্যাক।

“আমাদের সাইকিয়াট্রিস্ট আছে, তারাও কথা বলার চেষ্টা করেছে। পরিবারগুলোর সাথে কথা বলে মনে হচ্ছে, যাওয়ার আগে সুস্থ ছিল। টর্চারড, কাজের ওভারলোড কিংবা কোনো ধাক্কা খেয়েছে,” বলেন শরিফুল।

তার ভাষ্য, মানসিক নির্যাতিত হয় এদের সবাই। তবে শুধু মানসিক কারণে কেউ অসুস্থ হয় না, যৌন হয়রানি, শারীরিক নির্যাতন এসব কারণে হয়। এদের ক্ষেত্রে নির্যাতন মাত্রা ছাড়িয়ে গেছে। সবকিছু মিলিয়ে এসব গৃহকর্মীরা মানসিক ভারসাম্যহীন হচ্ছে। যদিও এটা প্রমাণ করা কঠিন।

সৌদি আরবে বাংলাদেশি অভিবাসীদের ভালো-মন্দ দেখভালের দায়িত্ব সেখানকার বাংলাদেশ দূতাবাসের। কিন্তু গৃহকর্মীদের ‘মানসিক ভারসাম্যহীন’ হয়ে ফেরার কারণ কী, তা বাংলাদেশ দূতাবাস জানার চেষ্টা করে কি?

এমন প্রশ্নে কোনো স্পষ্ট জবাব দিতে পারেননি সৌদি আরবে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত গোলাম মসীহ। এমন কোনো তথ্যও পাননি বলে জানান তিনি। তবে দুই-এক জনের ক্ষেত্রে এমনটা হতেই পারে বলে মনে করেন তিনি।

“…… দেড় লক্ষ লোকের মধ্যে একটা লোক, দুইটা লোক বা পাঁচটা লোক একটু মেন্টালি ইয়ে হতেই পারে। দ্যাট ইজ নাথিং অ্যান্ড অ্যান্ড ইয়ে। এখান থেকে ফিরে গিয়েই যে সে মেন্টালি আপসেট হয়ে পড়েছে সেরকম কিছু না,” বলেন রাষ্ট্রদূত।

তার ভাষ্য, সৌদি আরবের আবহাওয়া, তাপমাত্রা, খাদ্যাভ্যাস, জীবন-ধারণ পদ্ধতি পুরোপুরি আলাদা হওয়ায় গৃহকর্মীরা মানসিকভাবে ‘আঘাতপ্রাপ্ত’ হয় এবং খাপ খাওয়াতে পারে না। এজন্য তিনি কর্মীদের উপযুক্ত প্রশিক্ষণ না পাওয়াকে দায়ী করেন তিনি।

নারী গৃহকর্মীরা ‘মানসিক ভারসাম্যহীন’ হয়ে দেশে ফেরে, সেটিও মানতে নারাজ গোলাম মসিহ।

তিনি বলেন, “মেন্টালি ইয়ে হয়ে যায় দ্যাটস নট অ্যাকচ্যুয়ালি হানড্রেড পার্সেন্ট কারেক্ট আমি বলব না। আমি যেটা দেখছি এখানে আইসা খুব ডেসপারেট থাকে। ভেঙে পড়ে। দেখেন বিকজ অব ডেসপারেশন টু গো ব্যাক হোম, ইট ইজ নট অনলি সাইকোলজিক্যাল। ইফ ইট ইজ সাইকোলজিক্যাল দে হ্যাভ সামথিং হ্যাজ হেপেন ব্যাক অ্যাট হোম। অর দ্য আর ডেসপারেট টু গো ব্যাক। যখন আবার দেশে যায় দে বিকাম নরমাল।”

গত দুই মাসে ছয় জনের ‘মানসিক ভারসাম্যহীন’ হয়ে ফেরার বিষয়টি তার নজরে আনা হলে তিনি বলেন, “দুই চারটা কেস যেটা আপনি বললেন, দিস ইজ ভেরি আনফরচ্যুনেট দ্যট ইট হেপেনড। বাট আমাদের এরকম নলেজে নাই।“

“আমাদের এইখানে এই পর্যন্ত কেউ আসে নাই যে মেন্টাল একদম সিক হয়ে পড়েছে। আমাদের মেন্টাল হসপিটালে নিতে হয়েছে এরকম উই নেভার কেইম অ্যাক্রস। .. দিস ইজ আউট অব টোটাল ডেসপারেশন।”

২০১১ সালের এপ্রিলে সৌদি ন্যাশনাল রিক্রুটমেন্ট কমিটি বাংলাদেশ থেকে গৃহকর্মী নিতে জনশক্তি রপ্তানিকারকদের সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটিং এজেন্সিসের (বায়রা) সঙ্গে সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষর করেছিল।

তবে সৌদি আরবে কর্মরত ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপাইন ও শ্রীলঙ্কার ১৫০ জন গৃহকর্মীর সাক্ষাৎকারে ‘শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের’ ঘটনা উঠে আসে ২০১০ সালে হিউম্যান রাইটস ওয়াচের এক প্রতিবেদনে। ফলে সমঝোতা স্মারক সই হলেও কোনো নারী কর্মী সৌদি আরবে যাননি।

এরপর গৃহকর্মী নিতে বাংলাদেশের সঙ্গে ২০১৫ সালে চুক্তি করে সৌদি আরব। সেই চুক্তিতে নারী গৃহকর্মীর ওপর জোর দিয়ে একজন নারীর বিপরীতে ২/৩ জন পুরুষ শ্রমিক নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেয় দেশটি। এরপরই শুরু হয় নারী গৃহকর্মী পাঠানো।

সৌদি আরবে বাংলাদেশ দূতাবাসের তথ্যমতে, এ পর্যন্ত প্রায় এক লাখ ৬০ হাজার গৃহকর্মী গেছেন দেশটিতে। এর মধ্যে গত চার বছরে দেশে ফিরেছেন প্রায় ৬ হাজার গৃহকর্মী। তবে এর মধ্যে কতজন ‘মানসিক ভারসাম্যহীন’ হয়ে ফিরেছেন তার কোনো সঠিক হিসাব পাওয়া যায়নি।

শেয়ার করুন:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *