Monday, January 20

হারিয়ে যাচ্ছে গ্রামীন ঐতিহ্য ‘গরুবারী’ প্রথা



শিপন আহমদ :: ‘রাখাল ছেলে! রাখাল ছেলে! বারেক ফিরে চাও/ বাঁকা গাঁয়ের পথটি বেয়ে কোথায় চলে যাও?’/ রাখাল গরু চরায় কেটে যায় বেলা/ চাষি ভাই করে চাষ কাজে নাহি হেলা” আ ন ম বজলুর রশীদ রচিত ‘আমাদের দেশ’ ও পল্লী কবি জসীমউদদীন রচিত ‘রাখাল ছেলে’ কবিতায় গ্রামীন জনপদের রাখাল ছেলের অপরিসীম গুরুত্ব ও তাৎপর্য ফুটে উঠলে কালের বিবর্তনে আজ সিলেট অঞ্চলে গ্রাম বাংলা সেই রাখালের অস্থিত্ব খোঁজে পাওয়া দূস্কর হয়ে আছে। তারই সাথে সাথে হারিয়ে যাচ্ছে গ্রামীন ঐতিহ্য ‘গরুবারী’ প্রথা। এ সময় সিলেটের প্রতিটি এলাকায় গ্ররুবারী প্রথ্যা চালু ছিল। নিয়মনুযায়ী প্রতিদিন গ্রামের একেক জন ব্যাক্তি ওই গ্রামের সবার গরু একত্রিত করে মাঠে নিয়ে গিয়ে রাখালের দ্বায়িত্ব পালন করতেন। আবার বিকাল হলে নিজ দ্বায়িত্বে গরুগুলোকে তাদের মালিকদের কাছে সমজাইয়া দিতেন। একযুগ আগেও সমাজের সবচেয়ে দরিদ্র পরিবারের থেকে আসা রাখালেরা ছিলো পেটের দায়ে গৃহস্থ বাড়ির অলিখিত চুক্তি ভিত্তিক দাস। রাখালের সাথে গৃহস্থ বাড়ির সস্পর্কের ভিন্ন মাত্রা অন্য কিছুর সাথে তুলনা হতো না।
অনেক পরিবারেই রাখালের উপর থাকতো সংসারের গোটা দায়িত্ব। রাখালের বীরত্বের কাহিনী গ্রাম ছাপিয়ে ছড়িয়ে যেতো গ্রাম-গ্রামান্তরে। গৃহস্থ পরিবারের ছোট ছেলে-মেয়েদের প্রথম বন্ধু ছিলো রাখাল। কালের বিবর্তনে গরুবারী প্রথা বিলুপ্ত হওয়ায় রাখালদের কদরও পুরিয়ে গেছে। ফলে রাখালের দায়িত্বে গ্রামের সবার গরুগুলোকে একত্রিত করে ঘাস খাওয়ার সেই চিরচেনা চিত্র হয়তো আর কোনো দিনই আমাদের চোখে পড়বে না। আগেরকার দিনে শুষ্ক মৌসুমে প্রতিদিন একজন রাখালের দ্বায়িত্বে ছোট বড় হালের বলদ দুধের গাভী ও বাচ্চা সহ কয়েক শতাধিক গরু একত্রিত করে এক সাথে খোলা আকাশের নিচে কোনো না কোনো মাঠে ঘাস খাওয়াতেন। একজন রাখালের দ্বায়িত্বে গরুগুলোকে একত্রিত করে ঘাস খাওয়াকে বলা হত ‘গরুবারী’।
গ্রামের সকল গরুকে একত্রিত করে যিনি রাখালের দায়িত্ব পালন করতেন তাকে বলা হত ‘গরুবারীদার’। তখনকার দিনে গ্রামে গরুবারী নিয়ম ছিলো-এরকম বড় গ্রাম হলে গ্রামে গৃহস্থদের বেশি সংখ্যক গরু থাকলে সে ক্ষেত্রে দু’ ঘরের দুই জন এক সাথে রাখালের দায়িত্ব পালন করতেন। এভাবে সিলেটের প্রতিটি গ্রামে এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্ত পর্যন্ত ধারাবাহিক ভাবে গরুবারী দেয়া হত। ছোট গ্রাম হলে তাতে গরুর সংখ্যা কম হত সে ক্ষেত্রে ঐ গ্রামের একজনই বারীদারের দায়িত্ব পালন করতেন।
সে নিয়ম অনুযায়ী ধারাবাহিক ভাবে প্রতিটি গ্রামের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্ত পর্যন্ত সবাইকে পর্যায়ক্রমে (যাদের গরু আছে) গরুবারীদারের দায়িত্ব পালন করতে হত। সকাল ভেলা গ্রামের গৃহস্থ গোয়ালঘরের দরজা খুলে গরু গুলোকে ঘর থেকে বের করে নিজ দায়িত্বে বারীদারের কাছে সমজিয়ে দিয়ে আসতেন। আবার ঠিক সন্ধ্যা হবার পূর্ব মুহূর্তে গরুগুলোকে নিজ দায়িত্বে বারীদারের কাছ থেকে বুঝিয়া আনতেন। দিন দিন দেশের জনসংখ্যা বৃদ্দির পাশাপাশি হাওরঅঞ্চল কমে যাওয়া,অনাবাদি জমিকে প্রযুক্তির মাধ্যমে চাষাবাদের আওতায় নিয়ে আসা।
কৃষি জমিতে দালান কোঠা নির্মাণের ফলে হাওরগুলোতে এখন আর খালি মাঠ না থাকায় গবাদী পশু গুলোকে উন্মক্ত স্থানে চড়িয়ে ঘাস খাওয়ার মত পর্যাপ্ত জায়গা দিন দিন সংকুচিত হচ্ছে। সেই সাথে হারিয়ে গেছে গরুবারী প্রথা। অন্যদিকে গরু দিয়ে হাল চাষ বা ধান মাড়াই দেয়ার বিকল্প পদ্ধতি আবিষ্কার হওয়ায় কৃষকরা আগের মতো গরু পালনের প্রয়োজন হচ্ছে না। বর্তমান সময়ে কৃষকরা জমির উর্বরশক্তি বাড়ানোর জন্য জমিতে রাসায়নিক সার ব্যবহার করছেন। কিন্তু এক সময় গরুর গোবরই একমাত্র সার হিসেবে জমিতে ব্যবহার হত।
আবার গ্রামের হতদরিদ্র লোকজন গরুর গোবর দিয়ে গুই বানিয়ে (সিলেটি ভাষায় যেটাকে মুটিয়া বলা হত) বানিয়ে উনুনে জ্বালিয়ে রান্নাবান্নার কাজে ব্যবহার করতেন। এলাকার প্রবিন মুরব্বি আপ্তাবুর রহমান, করিম মিয়া সহ একাধিন বয়স্ক লোকজন বলেন, ছোটবেলায় উনারাও প্রায় সময় গরুবারী দিয়েছেন। এমনকী আমরা লেখা পড়ার ফাঁকে সকাল বিকাল আমাদের গরুগুলিকে হাওরে নিয়ে যেত হত বারীদারের কাছে। অভিবাবকদের আদেশনুযায়ী বারীদারের কাছে গরুগুলোকে না নিয়ে গেলে মা-বাবার রক্ষ চোঁখ দেখতেহত আমাদের। তখনকার সময়ে গরু বারী দেওয়াতে একজনের বিশেষ অসুবিধা হলে তার পরিবর্তে অন্য আরেক জন ঐ দায়িত্বটুকু পালন করতেন। গ্রাম অঞ্চলে গরুবারী দেয়ার মতো যাদের নিজের মানুষ ছিল না তারা টাকার বিনিময়ে অন্য একজনকে বারীদারের দায়িত্ব দিয়ে দিতেন। সে সময় গরুবারীর মাধ্যমে আয়েরও একটা সুযোগ থাকায় গ্রামের অনেক বেকার যুবকরাই রাখালের দ্বায়িত্ব পালন করতে দেখা যেত।

শেয়ার করুন:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *